• বৃহস্পতিবার   ২৬ নভেম্বর ২০২০ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১২ ১৪২৭

  • || ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

শরীয়তপুর বার্তা
৭৫

আত্মীয়-প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তম আচরণে বিশ্বনবীর আদর্শ

শরীয়তপুর বার্তা

প্রকাশিত: ১৮ নভেম্বর ২০২০  

ইসলাম এমন এক পরিপূর্ণ ধর্ম; যার শিক্ষার মাঝে সব কিছু বিদ্যমান। আত্মীয় এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তম আচরণে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ়করণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাল ব্যবহার করা। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন-

‘আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তার সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করো না এবং সদয় ব্যবহার কর বাবা-মার সঙ্গে, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতিম, মিসকিন, প্রতিবেশী এবং অনাত্মীয় অসহায় মুসাফির এবং নিজের সঙ্গী -সহচর ও পথচারীদের সঙ্গে। আর তোমাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে; তাদের সঙ্গে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা দাম্ভিক-অহংকারীকে ভালোবাসেন না।’ (সুরা নিসা : আয়াত ৩৬)

মহান আল্লাহ তাআলা বিশ্বমানবতার জন্য আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশির সঙ্গে উত্তর আচরণ শিক্ষা দিতে বিশ্বনবির প্রতি এ আয়াত নাজিল করে তুলে ধরেছেন ইসলামের অতুলনীয় সুমহান শিক্ষা।

আমরা যেন নিজেদের ভাই, আত্মীয়-স্বজন, আপনজন এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণ করি। সব ভালো কাজের বিষয়ে তাদের সহযোগিতা করি। তাদের সব ভালো কাজের প্রয়োজনে যথাসাধ্য সাহায্য-সহযোগিতা করি। যতদূর সম্ভব তাদের কল্যাণ পৌঁছে দেই।

আর এমন সব লোকদেরও সাহায্য করি যাদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই এবং চেনা-জানাও নেই কিন্তু তারা অসহায়; অপরিচিত মুসাফির। কেননা যদিও তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই, অল্প সময়ের জন্য সাক্ষাত হয়েছে, তাদেরও যদি কোনো প্রকার সাহায্যের প্রয়োজন হয়, ইসলামের আলোকিত উপদেশ ও বিশ্বনবির আদর্শ হচ্ছে তাদের সাহায্য করা।

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা শুধু ইসলামের নির্দেশনাই নয়; বরং এতে অনেক ফজিলত ও মর্যাদাও রয়েছে। কেননা, আত্মীয়তার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা, তাদের খোঁজ-খবর নেয়া, তাদের কাছে আসা-যাওয়া করাও ইবাদতেরই অংশ। এ বিষয়টি যেভাবে তুলে ধরেছেন বিশ্বনবি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাহলো-
- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযা সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিক প্রশস্ত হওয়া এবং মৃত্যুর সময় পিছিয়ে দেয়া কামনা করে, তার উচিত আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা।’ (বুখারি)
- হজরত আবু আইয়ুব আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে এমন আমল বলে দিন; যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। তখন তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহর ইবাদত কর, তার সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করো না। নামাজ ভাল করে আদায় কর এবং জাকাত দাও আর আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখ।’ (বুখারি)

আত্মীয়রা যখন কারো সঙ্গে অন্যায় করবে বা দুর্ব্যবহার করবে তখনও তাদের সঙ্গে অন্যায় কিংবা খারাপ আচরণ করা যাবে না। হাদিসের নির্দেশনাও এমনই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী নয়, যে সম্পর্ক রক্ষাকারীর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে; বরং প্রকৃত সম্পর্ক রক্ষাকারী সে, যে সম্পর্ক ছিন্নকারীরর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে।’ (বুখারি)

আবার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম। প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সম্পর্কে বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন। হাদিসে এসেছে-

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (বুখারি)

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদর্শের ওপর আমল করলেই সম্ভব সুন্দর অতুলনীয় ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হওয়া সম্ভব। যে সমাজের ব্যক্তি পরিবার কিংবা সমাজের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হবে না। ভাই-ভাই বন্ধন নষ্ট হবে না। বৌ-শাশুড়ির বিবাদ-কলহ থাকবে না। পাড়া-প্রতিবেশির হিংসাত্মক শত্রুতা ও প্রতিযোগিতা থাকবে না।

বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নসিহত গ্রহণে ব্যক্তি পরিবার সমাজের প্রত্যেকের সঙ্গে তৈরি হবে মধুর সুসম্পর্ক। সবাই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বসবাস করবে। একে অন্যের উপকারে থাকবে উদার ও সচেষ্ট। এ সবই ইসলাম ও মুসলমানের ঐতিহ্য। বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সর্বোত্তম আচরণ ও আদর্শের বহিঃপ্রকাশ।

কেননা ইসলামে যেসব অধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, আত্মীয়তা-প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে অধিক মাত্রায় তাগিদ করা হয়েছে। কুরআনের নির্দেশনায় তা ওঠে এসেছে। বিশ্বনবি অনেক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, ‘জিবরিল আলাইহিস সালাম এসে আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে অবিরত উপদেশ দিতে থাকেন। আমার এমনটি মনে হল যে, হয়তো তিনি প্রতিবেশীকে সম্পদের ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকার বানিয়ে দেবেন।’ (মুসলিম)

ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায় এতবেশি গুরুত্ব দিয়েছেন যে, কাফেরদের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখতে আর আত্মীয় অমুসলিম হলেও তার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে উৎসাহিত করা হয়েছে। হাদিসে এসেছে-

হজরত আসমা বিনতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় আমার আম্মা মুশরিকা থাকতে একবার আমার কাছে আসেন। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে জিজ্ঞাসা করলাম- তিনি (আমার আম্মা) আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী; আমি কি আমার আম্মার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবো? বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ’, তুমি নিজ মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)

এ কারণেই ইসলামের অসংখ্য অনুশাসন মেনে চলার পরও কোনো লোক মুমিনের কাফেলায় অন্তর্ভূক্ত হতে পারে না; যদি সে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী হয় আর প্রতিবেশির সঙ্গে উত্তম আচরণকারী না হয়।

কেননা ইসলামের নির্দেশনাই হচ্ছে কোনো মুমিন ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন করতে পারে না। আর সেই সঙ্গে তার প্রতিবেশীরও ক্ষতি করতে পারে না। ইসলামের এ শিক্ষা উপেক্ষা করে কারো পক্ষে পূর্ণ মুমিন হওয়া সম্ভব নয়। বস্তুত আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী এবং প্রতিবেশীর অনিষ্ট সাধনকারী ব্যক্তিকে ইসলাম মুমিন বলে স্বীকৃতি দিতেও প্রস্তুত নয়। হাদিসে এসেছে-

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন,রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাস বলেন, ‘আল্লাহর শপথ! সে মুমিন নয়। জিজ্ঞাসা করা হলো- কে মুমিন নয়? ইয়া রাসুলুল্লাহ! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেন- যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।’ (বুখারি ও মুসলিম)

সুতরাং মুমিন মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে- আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় রাখা এবং প্রতিবেশীর সুবিধা-অসুবিধার দিকে দৃষ্টি রাখা। এক প্রতিবেশী দ্বারা অন্য প্রতিবেশীর যাতে কোনো ধরণের ক্ষতি না হয় তা সব সময় খেয়াল রাখা। হোক না আমার প্রতিবেশী ভিন্ন ধর্মের বা ভিন্ন মত ও পথের অনুসারী।

এমনটি ঠিক নয়-
কারো সঙ্গে আমার মত ও পথের সঙ্গে তার মিল নাও থাকতে পারে, তাই বলে কি তার সঙ্গে আমার আচরণ খারাপ হবে? মোটেও নয়। ধর্মীয় মূল্যবোধে প্রতিবেশীর অধিকার এতো ব্যাপক ও বিস্তৃত যে দৈনন্দিন জীবনের সর্বাবস্থায় প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর নেয়ার শিক্ষা ইসলামে রয়েছে।

সুতরাং আমাদের করণীয়-
সাহাবাদের লক্ষ্য করে একবার বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা কি জান প্রতিবেশীর হক কি? তাহলো-
- যদি সে তোমার কাছে সাহায্যপ্রার্থী হয়; তাকে সাহায্য করবে।
- যদি সে ধার চায়; তাকে ধার দেবে।
- যদি সে অভাবগ্রস্থ হয়; তার অভাব মোচন করবে।
- যদি সে রোগাগ্রস্থ হয়; তাকে সেবা দান করবে।
- যদি তার মৃত্যু হয়; জানাজায় শরীক হবে।
- যদি তার মঙ্গল হয়; তাকে উৎসাহিত করবে।
- যদি তার বিপদ হয়; তাকে সহানুভূতি জানাবে।
- প্রতিবেশির অনুমতি ব্যতিত তোমার ঘর এত উঁচু করবে না; যাতে তার প্রতিবেশির আলো বাতাস বন্ধ হয়।
- যদি তুমি ফলমূল কেনাকাটা কর; কিছু অংশ প্রতিবেশীর জন্য উপহারস্বরূপ পাঠাবে আর যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে তা গোপনে তোমার সন্তানদের খেতে দিবে যেন প্রতিবেশীর ছেলে মেয়ে তার বাবা মাকে বিরক্ত না করে। তবে এমনটি হওয়া উচিত নয়।

আমাদেরকে বুঝতে হবে-
প্রতিবেশী সে যেই হোক, জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই প্রতিবেশী আর সবাই সমান মর্যাদা পাবে এবং মানবিক ব্যবহার বিনিময়ে সবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার বজায় রাখতে হবে।

আসুন না, আমরা সবাই সবার আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশির খোঁজ-খবর রাখি আর তাদের সুখে দুঃখে পাশে গিয়ে দাঁড়াই। কুরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনা মেনে চলি।

আল্লাহ তাআলা বিশ্বমানবতাদর সবাইকে আত্মীয় ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট রাখার তাওফিক দান করুন। প্রতিবেশির সঙ্গে উত্তম আচরণ করার ক্ষেত্রে হাদিসের উপর যথাযথ আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ধর্ম বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর