• শুক্রবার   ০৭ আগস্ট ২০২০ ||

  • শ্রাবণ ২৩ ১৪২৭

  • || ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

শরীয়তপুর বার্তা
৩১

বন্যাদুর্গত কৃষকদের চার স্তরে সোয়া ৭ কোটি টাকার প্রণোদনা

শরীয়তপুর বার্তা

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২০  

চলমান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষকদের চার স্তরে ৭ কোটি ১৯ লাখ ৮ হাজার টাকার প্রণোদনা দেবে সরকার। কমিউনিটিভিত্তিক রোপা আমন ধানের চারা উৎপাদন, ভাসমান বেডে রোপা আমন ধানের চারা উৎপাদন, রোপণ যন্ত্রের (ট্রান্সপ্ল্যান্টার) মাধ্যমে রোপণের জন্য ট্রেতে নাবী জাতের আমন ধানের চারা উৎপাদন ও তা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ এবং মাসকলাইয়ের বীজ বিতরণ— এ চারটি মাধ্যমে ৮৮ হাজার ৩১ জন কৃষককে প্রণোদনা দেয়া হবে।

কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এ তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২ কোটি ১৪ লাখ টাকার কমিউনিটিভিত্তিক রোপা আমন ধানের চারা পাবেন ৩৫ হাজার ১৬৬ জন কৃষক। ভাসমান বেডে রোপা আমন ধানের চারা উৎপাদন ও বিতরণে এক হাজার ২৬৫ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পাবেন ৬৯ কোটি টাকার প্রণোদনা। এছাড়া রোপণ যন্ত্রের মাধ্যমে রোপণের জন্য ট্রেতে নাবী জাতের আমন ধানের চারা উৎপাদন করে তা এক হাজার ৬০০ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে, এতে সরকারের ব্যয় হবে ৫৪ লাখ ৮ হাজার টাকা। ৫০ হাজার কৃষককে বিনামূল্যে মাসকলাইয়ের বীজ বিতরণ করা হবে, এতে ব্যয় হবে ৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ অনুবিভাগ) মো. মাহবুবুল ইসলাম জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চার স্তরে প্রণোদনা দেয়া হবে। ইতোমধ্যে কমিউনিটি বীজতলা, ভাসমান বীজতলা ও ট্রান্সপ্ল্যান্টারের মাধ্যমে রোপণের জন্য ট্রেতে নাবী জাতের আমন ধানের চারা উৎপাদন ও বিতরণের জন্য প্রণোদনার অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এরপর মাসকলাইয়ের প্রণোদনার অর্থ ছাড় করা হবে।

অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘বন্যার কারণে কৃষকের রোপা আমন ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন তারা চারা কোথায় পাবে? এই সহায়তা আমরা বন্যাদুর্গত এলাকার প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিদের দেব। আমরা চারা উৎপাদন করে তা কৃষকদের বিনামূল্যে দেব। যেখানে ধান লাগানোর সুযোগ নেই, সেখানে মাসকলাই লাগাবে। সেজন্য আমরা প্রণোদনা দেব, তবে এটা আরও পরে ঘোষণা করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন এক ইঞ্চি জমিও যাতে অনাবাদি না থাকে। বন্যার কারণে ফসল নষ্ট হওয়ার পর যদি কৃষক আবার সেখানে ফসল ফলাতে না পারে তবে তো সেটা অনাবাদি থেকে গেল। সেই বিষয়টি অ্যাসেস করেই আমরা প্রণোদনা দিচ্ছি।’

‘আশা করি প্রণোদনার মাধ্যমে দরিদ্র কৃষক তার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবে। এছাড়া এর মাধ্যমে আমরা বাড়তি উৎপাদনও পাব বলে আশা করছি।’

মাহবুবুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলা কৃষি পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটি নির্ধারণ করবে কারা প্রণোদনা পাবে। জেলা কমিটি তা মনিটরিং করবে। অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রণোদনার জন্য কৃষকদের তালিকা করা হবে, যে কেউ খেয়াল-খুশিমতো তালিকা করতে পারবে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এই উপকরণ বিতরণ করা হবে।’

ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। গত ২৬ জুন থেকে বন্যা শুরু হয়, এরপর পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হলেও ১১ জুলাই থেকে দ্বিতীয় দফায় পানি বাড়ে। সর্বশেষ ২১ জুলাই থেকে তৃতীয় দফায় পানি বাড়ছে। এই বন্যা আরও কিছুদিন থাকতে পারে বলে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে জানানো হয়েছে।

প্রথম পর্যায়ের বন্যায় প্রায় ৩৪৯ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বন্যায় আউশ, আমন, সবজি, পাটসহ বেশ কিছু ফসলের অনেক ক্ষতি হয়েছে। বিকল্প বীজতলা তৈরি, ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে বিকল্প ফসল চাষের ব্যবস্থা, নিয়মিতভাবে আবহাওয়া মনিটরিংসহ প্রস্তুতি চলছে যাতে বন্যার কারণে ফসলের ক্ষতি মোকাবিলা করা যায়।’

প্রণোদনার অর্থ বরাদ্দের চিঠিতে বলা হয়েছে, বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত ৩৩ জেলায় কৃষকের জমিতে কমিউনিটিভিত্তিক রোপা আমন ধানের চারা উৎপাদন এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য দুই কোটি ১৪ লাখ টাকা প্রণোদনা দেবে সরকার।

এই প্রণোদনার আওতায় ৫২৭ দশমিক ৫০ একর জমিতে রোপা আমনের বীজতলা তৈরি করা হবে। উপকারভোগী কৃষকের সংখ্যা ৩৫ হাজার ১৬৬ জন। বিআর-২২, বিআর-২৩, নাজিরশাইল, বিনাশাইল রোপা আমন ধানের বীজতলা ও চারা তৈরি করা হবে।

এই কর্মসূচির আওতাভুক্ত জেলাগুলো হলো- ঢাকা, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোণা, চাঁদপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নওগাঁ, বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী ও শরীয়তপুর।

এ কর্মসূচির আওতায় অনুমোদিত অগ্রাধিকার তালিকাভুক্ত প্রতি জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবার এক বিঘা জমিতে রোপণের জন্য বিনামূল্যে ১ দশমিক ৫০ শতক জমির রোপা আমন ধানের চারা পাবেন।

৪০টি জেলায় ভাসমান বেডে রোপা আমন ধানের চারা উৎপাদন এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ৬৯ লাখ টাকার কৃষি প্রণোদনা দেয়া হবে। প্রস্তাবিত রোপা আমন বীজতলা তৈরির পরিমাণ ৫ হাজার ৬০টি ভাসমান বেড, প্রতি ভাসমান বেডের দৈর্ঘ্য ১০ মিটার ও প্রস্থ ১ দশমিক ২৫ মিটার, মোট বীজতলার পরিমাণ ৬ দশমিক ৩২৫ হেক্টর বা ১৫ দশমিক ৬২৩ একর বা ৪৭ দশমিক ৩৪২ বিঘা। উপকারভোগী কৃষক এক হাজার ২৬৫ জন। বিআর-২২ ও বিআর-২৩ রোপা আমনের জাতের বীজতলায় চারা তৈরি করা হবে।

গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোণা, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, রাজশাহী, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, নড়াইল, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, ও শরীয়তপুরে ভাসমান বীজতলা তৈরি করা হবে।

এ কর্মসূচির আওতায় উৎপাদিত চারার মাধ্যমে ১২৬ দশমিক ৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের জমি চাষ করা হবে। এতে হেক্টরপ্রতি ২ দশমিক ৮৫ টন ফলন ধরে ১২৬ দশমিক ৫ হেক্টর জমিতে মোট ৩৬০ দশমিক ৫২৫ টন চাল উৎপাদিত হবে। প্রতি টন চাল ৩৮ হাজার টাকা করে ধরে মূল্য হবে এক কোটি ৩৬ লাখ ৯৯ হাজার ৯৫০ টাকা।

প্রত্যেকটি ভাসমান বেডে বীজতলার ব্যয় হবে এক হাজার ৩৬৫ টাকা। এরমধ্যে বীজ বাবদ ব্যয় (প্রতি বেডে এক কেজি বীজ, প্রতি কেজি ৪০ টাকা হারে) ৪০ টাকা, ভাসমান বেড তৈরিতে ব্যয় এক হাজার ১০০ টাকা, পরিচর্যা ব্যয় (আগাছা দমন, সার প্রয়োগ) হবে ১৫০ টাকা। বীজ বা চারা উৎপাদনের মোট ব্যয় এক হাজার ২৯০ টাকা, এর সঙ্গে আনুষঙ্গিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৫ টাকা।

রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টারের মাধ্যমে রোপণের জন্য ট্রেতে নাবী জাতের আমন ধানের চারা উৎপাদন ও বিতরণ করা হবে ২৫টি জেলায়। প্রস্তাবিত রোপা আমন বীজতলা হবে ৪১ হাজার ৬০০টি ট্রেতে। উপকারভোগী কৃষক এক হাজার ৬০০ জন।

গাজীপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী ও শরীয়তপুরে কৃষকদের এই প্রণোদনা দেয়া হবে।

কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি অফিসার প্রণোদনা কর্মসূচির জন্য মনোনীত প্রত্যেক কৃষকের স্ট্যাম্প সাইজের ছবিযুক্ত উপকরণ কার্ডের ভর্তুকি অংশে যথাযথভাবে উপকরণের পরিমাণ লিপিবদ্ধ করে মাস্টাররোল সংরক্ষণ করে সেসব বিতরণ করবেন। কোনো কৃষকের উপকরণ কার্ড না থাকলে সেক্ষেত্রে মাস্টাররোলে কৃষকের নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর (যদি থাকে), স্ট্যাম্প সাইজের ছবি সংযুক্ত করে মাস্টাররোলে সংরক্ষণ করতে হবে।

অর্থনীতি বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর