• মঙ্গলবার   ০২ মার্চ ২০২১ ||

  • ফাল্গুন ১৭ ১৪২৭

  • || ১৮ রজব ১৪৪২

শরীয়তপুর বার্তা

ভ্যাকসিন দিতে প্রস্তুত হচ্ছে ৫ হাসপাতাল

শরীয়তপুর বার্তা

প্রকাশিত: ২৬ জানুয়ারি ২০২১  

করোনা ভাইরাসের বহুল প্রতীক্ষিত ভ্যাকসিন দেশে এসেছে। আজ ২৬ জানুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে এ ভ্যাকসিন পেতে ইচ্ছুকদের অনলাইনে নিবন্ধন কার্যক্রম। আগামী ২৭ জানুয়ারি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে প্রথম একজন নার্সের শরীরে প্রয়োগের মধ্য দিয়ে দেশে ভ্যাকসিন কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। ভার্চুয়ালি যুক্ত থেকে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ কর্মসূচি আরও গতি পাবে এদিনই এই হাসপাতালে সম্মুখ সারিতে থাকা বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিত্বকারী ২৪ জনের একটি দলকে ভ্যাকসিন দেওয়ার মাধ্যমে।  সেই তালিকায় চিকিৎসক, নার্স, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, পুলিশ, সেনাবাহিনী, সাংবাদিকসহ অন্য পেশার মানুষ যুক্ত থাকবে।

আর পরদিন ২৮ জানুয়ারি এই হাসপাতালের সঙ্গে আরও চারটি হাসপাতালে করোনার টিকা প্রয়োগ শুরু হবে। এগুলো হচ্ছে: ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।

এই পাঁচ হাসপাতালের পাঁচ পরিচালক বলেন, তারা ভ্যাকসিন কর্মসূচি চালু করতে প্রস্তুতি নিয়েছেন, তারা প্রস্তুত। তবে তাদের কেউ কেউ বলছেন, জাতীয়ভাবে কর্মসূচি চালু হওয়ার পর কিছুটা সমস্যা হতে পারে-যেটা চ্যালেঞ্জ মনে হচ্ছে। তবে সেসব কিছু মাথায় নিয়েই কাজ করছেন তারা। প্রথমদিন যদি সবকিছু ঠিক ভাবে করা যায়, তাহলে মানুষের আস্থা আসবে, ধীরে ধীরে ভ্যাকসিন নিতে মানুষ উদ্বুদ্ধ হবে।

এসব হাসপাতালের ৪০০ থেকে ৫০০ জন স্বাস্থ্যকর্মীদের ভ্যাকসিন দিয়েই এ কার্যক্রম শুরু হবে-জানিয়েছেন স্বাস্থ্য সচিব আব্দুল মান্নান। বলেছেন, ‘এরপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুযায়ী তাদের পর্যবেক্ষণ করা হবে, তাদের মধ্যে কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় কিনা সেটা দেখা হবে।’

ইতোমধ্যেই গত ২০ জানুয়ারি ভারত সরকারের উপহার দেওয়া অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি কোভিশিল্ড টিকা দেশে এসে পৌঁছায়। সোমবার (২১ জানুয়ারি) দেশে এসে পৌঁছেছে সরকারের কিনে নেওয়া তিন কোটি ভ্যাকসিনের প্রথম ৫০ লাখ ডোজ।

এই ৭০ লাখ টিকার ভেতরে ৬০ লাখ টিকা দেওয়া হবে প্রথম মাসে, দ্বিতীয় মাসে দেওয়া হবে ৫০ লাখ, তৃতীয় মাসে দেওয়া হবে আবার ৬০ লাখ। প্রথম মাসে টিকা পাওয়াদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে তৃতীয় মাসে। আর এ হিসাবে ভ্যাকসিন বিতরণ পরিকল্পনা ইতোমধ্যে করা হয়ে গেছে। কিনে নেওয়া টিকা দেশে আসার পর ঢাকা থেকে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস চুক্তি অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন জেলাতে টিকা পৌঁছে দেবে।

ভ্যাকসিন নেওয়ার প্রস্তুতি মোটামুটি ভালোই, সবকিছু প্রস্তুত হচ্ছে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক।

ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য কতজন স্বাস্থ্যকর্মী প্রস্তুত করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনও সেভাবে ফাইনাল করিনি, তবে পরিকল্পনা রয়েছে ১০০ জনের মতো স্বেচ্ছাকর্মীকে দিতে পারা যায় না, সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি’। আমাদের অনেক চিকিৎসক আগ্রহী প্রথম দিনেই টিকা নিতে, বলেন তিনি।

‘তবে আমি নিজে হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে প্রথম টিকা নিতে আগ্রহী-আমার কলিগদের টিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করতে, উৎসাহ দেওয়ার জন্য, আস্থা জোগাতে।’

এ হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, টেকনোলজিস্ট,আনসারসহ সব বিভাগের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে এই ১০০ জনকে বাছাই করা হয়েছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিচতলাতে ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য বুথ চালু করা হয়েছে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক বলেন, এখানে টিকা দেওয়ার পর পর্যবেক্ষণ করা হবে। সেজন্য ‘পোস্ট ভ্যাকসিন এরিয়া’ প্রস্তুত করা হয়েছে, সেখানে পর্যবেক্ষণ করা হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক ( হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুলফিকার আমিন জানান তার হাসপাতালের প্রস্তুতির কথা। ‘আমাদের প্রিপারেশন অলমোস্ট আমরা শেষ করে ফেলেছি’-বলেন তিনি।  জানান, ২৪ জানুয়ারি এ হাসপাতালে এই টিকাদান কর্মসূচি কিভাবে পরিচালিত হবে সে বিষয়ে একটি মিটিং হয়।

তিনি জানান, সাধারণ মানুষের জন্য জাতীয়ভাবে টিকাদান কর্মসূচি চালু হবে তখন এ হাসপাতালে মোট আটটি বুথ থাকবে এবং প্রতিটি বুথে টিকা দেওয়ার জন্য দুইজন নার্স এবং চারজন করে স্বেচ্ছাসেবক থাকবেন।

ভ্যাকসিন দেওয়ার পর পোস্ট ওয়েটিং রুমে ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে তারা ৩০ মিনিট পর্যবেক্ষণে থাকবেন। আর এই সময়ে তাদের পর্যবেক্ষণের জন্য থাকবে একটি মেডিক্যাল টিম এবং স্ট্যান্ডবাই আরেকটি মেডিক্যাল টিম থাকবে যেখানে একজন ইন্টারনাল মেডিসিন স্পেশালিস্ট, দুইজন রেসিডেন্স এবং একজন আইসিইউ স্পেশালিস্ট থাকবেন।

তিনি জানান, আটটি অবর্জারভেশন বেড প্রস্তুত করা হয়েছে জীবনরক্ষাকারী সব ধরনের ওষুধ এবং যন্ত্রপাতিসহ। সেখানে ভ্যাকসিন নেওয়া ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ করা হবে, আর এই সময়ে যদি কারও আরও অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্টের প্রয়োজন হয় তাহলে হাসপাতালের সি ব্লকে ১০ তলায় চারটি শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে এইচডিইউ ( হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট) হিসেবে। আর এই কাজে একেবারেই একটি ডেডিকেটেড অ্যাম্বুলেন্সও রাখা হয়েছে।

রাত সাড়ে নয়টার দিকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুলফিকার আমিন বলেন, এখন পর্যন্ত হাসপাতালের ৩০০ জনের ওপরে চিকিৎসক ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য আবেদন করে নিবন্ধন করেছেন যার তালিকা আমার কাছে রয়েছে। তবে নার্সদের, তৃতীয় চতুর্থ, এমএলএসএস, আনসার এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা যার যার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে আবেদন করছেন।

আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে, সব বিভাগ থেকেই কয়েকজন করে নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের বলা ২০০ জনের তালিকা করা হবে। হাসপাতাল পরিচালক হিসেবে তিনি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়াও ভ্যাকসিন নিতে নিবন্ধন করেছেন।

‘আমি এবং ভিসি মহোদয় দুজনই ভ্যাকসিন নিচ্ছি”’, বলেন ব্রিগেডিয়ার জুলফিকার আমিন। হাসপাতালের অন্যদের উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি এবং এটা আমাদের প্রয়োজন, দায়িত্ব-যোগ করেন তিনি।

মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. অসীম কুমার নাথ বলেন, হাসপাতালের ভেতরে ভ্যাকসিনেশন সাইটে ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের কিছু ভাইটাল বিষয়-যেমন রক্তচাপ, ফুসফুসের অবস্থা এবং অ্যালার্জির কোনও সমস্যা রয়েছে কিনা-এসব কিছু যদি ঠিক থাকে তাহলে তাকে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে, সেখানে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে ৩০ মিনিটে। আর তাদের দেখার জন্য থাকবে একটি মেডিক্যাল টিম। যদি কোনও সমস্যা না হয় তাহলে তারা বাসায় চলে যাবে এবং তখন তাদের একটি টেলিমেডিসিনের জন্য ফোন নম্বর দেওয়া হবে। যদি বাড়ি যাওয়ার পর কোনও সমস্যা হয় তখন ওই নম্বরে তিনি কল করে প্রয়োজনীয় সেবা নেবেন।

ভ্যাকসিন রাখার জন্য হাসপাতালে আইএলআর ( হিমায়িত বাক্সের মধ্যে টিকা সংরক্ষণের  ব্যবস্থা) ফ্রিজ রয়েছে যেখানে তিন হাজার ভ্যাকসিন রাখার ব্যবস্থা আছে। এ হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স,ওয়ার্ডবয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তারক্ষী, টেকনোলজিস্টসহ মোট ১ হাজার ৪৭ জন কর্মী রয়েছেন।

তাদের মধ্যে ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে ১০০ থেকে ১৫০ জনের মতো মানুষকে প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। এ হাসপাতাল থেকে ইতোমধ্যে ১০০ জনের একটি তালিকা অধিদফতরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ডা অসীম কুমার নাথ বলেন, ‘তবে আমরা যাদের বয়স ৫০ বছরের নিচে তাদেরকে প্রায়োরিটি দিতে চাইছি।’

কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের পরিচালক ডা. এ কে এম সরয়ার উল আলম জানিয়েছেন, এ হাসপাতালের এ সংক্রান্ত প্রস্তুতি চলছে, এখনও ফাইনাল হয়নি। যারা ভ্যাকসিন দেবেন-তাদের প্রশিক্ষণ চলছে। এ হাসপাতালে কারা ভ্যাকসিন নেবেন তাদের তালিকা হচ্ছে, যাচাই বাচাই চলছে।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমেদ জানালেন, তার হাসপাতালে প্রস্তুতি শেষ। আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত-বলেন তিনি। এ হাসপাতালের ১০০ জনের তালিকা তৈরি করা হয়েছে প্রথম দিনের জন্য, পাশাপাশি ৫০ জনের আরেকটি টিম স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছে।

কেবল ২৭ কিংবা ২৮ তারিখকে ধরে এই পরিকল্পনা নয়, এই পরিকল্পনা অনেক লম্বা, হয়তো এই টিকাদান কর্মসূচি চালাতে হবে অনেক দিন-সে হিসেব ধরেই পরিকল্পনা। তিনি জানান, পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ম্যানেজমেন্ট টিম প্রস্তুত করা হয়েছে। গ্রহণকারীদের পর্যবেক্ষণে রাখার জন্য ২০টি শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে। সঙ্গে রাখা হয়েছে চার বেডের আইসিইউ ইউনিট।

আশাকরি খুব একটা সমস্যা হবে না-বলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমেদ। তবে একটু মোটিভেশন লাগবে সব লেভেলেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, অথচ এটা পার্ট অব হিস্ট্রি হওয়ার কথা। তাই আমাদের ইচ্ছে যারা সিনিয়র আছেন তাদেরকে দিয়ে এই হাসপাতালে এ কর্মসূচি চালু করার, যাতে করে অন্যদের ভয় বা আতঙ্ক কেটে যায়।