• রোববার ১৪ জুলাই ২০২৪ ||

  • আষাঢ় ২৯ ১৪৩১

  • || ০৬ মুহররম ১৪৪৬

শরীয়তপুর বার্তা

নুরের পথ ধরেই নাহিদরা, আড়ালে তিন ছাত্র সংগঠন

শরীয়তপুর বার্তা

প্রকাশিত: ৮ জুলাই ২০২৪  

সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা তুলে দেওয়ার দাবিতে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আন্দোলনের পরিচিত মুখ ছিলেন নুরুল হক নুর। যার হাত ধরে প্রথমে ছাত্র অধিকার পরিষদ, পরে গণঅধিকার পরিষদ নামে রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। সেই ধারার অনুসারী নাহিদ ইসলাম, যিনি ৫ জুন প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি বাতিলের হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের পর দ্বিতীয় দফা কোটাবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার সঙ্গে রয়েছেন আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী, যারা সরাসরি বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে আছেন।

আন্দোলনকারী ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, কোটা প্রথা তুলে দেওয়ার দাবিতে চলমান শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্রদলের নেতা ও  সাবেক কিছু নেতাকর্মী সক্রিয় রয়েছে।

কোটা প্রথা তুলে দেওয়ার দাবিতে চলমান কর্মসূচি পালিত হচ্ছে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে। এর সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম। তিনি ঢাকার বাসিন্দা।

গত বছরের শুরু থেকে গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক রেজা কিবরিয়া ও সদস্য সচিব নুরুল হক নুরের দ্বন্দ্বের সময় দল দুই ভাগ হয়ে পড়লে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নুরের অনুসারী হিসেবে পরিচিতদের একটি অংশ ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’ গড়ে তোলেন। নাহিদ ইসলাম এই সংগঠনের সদস্য সচিব।

সংগঠনের একাধিক নেতা জানান, শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠন, রাজনৈতিক ব্যক্তি, পরিসর ও সংস্কৃতি নির্মাণ, শিক্ষার্থী কল্যাণ, ছাত্র-নাগরিক রাজনীতি নির্মাণ ও রাষ্ট্র-রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে গত বছরের ৪ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সামনে এক সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’ আত্মপ্রকাশ করে। ডাকসুর সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক আখর হোসেনকে আহ্বায়ক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. নাহিদ ইসলামকে সদস্য সচিব করে ৩১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি করেছিল সংগঠনটি।

নাহিদ ইসলাম বিগত ডাকসু নির্বাচনে নুরুল হক নুরের প্যানেল থেকে সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছিলেন।

এ প্রসঙ্গে কোটাবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সাবেক নেতা নুরুল হক নুর বলেন, ‘এখন যারা কোটা প্রথা তুলে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন করছে, ২০১৮ সালে তাদের অনেকেই প্রথম, দ্বিতীয় বর্ষে পড়তো। যারা ছিল, তারা এখন গাইড করছে, দায়িত্বও নিয়েছে কেউ কেউ।’

নাহিদ ইসলামের প্রসঙ্গে নুর বলেন, ‘নাহিদ ইসলাম আমাদের প্যানেল থেকে নির্বাচন করেছিল ডাকসুতে। নাহিদসহ অনেকে আমার সঙ্গে ছিল ২০১৮ সালে। পরে গত বছর যখন ডাকসু নির্বাচনের আলোচনা এলো তখন তারা ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’ গঠন করে।’

গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি বলেন, ‘২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে যেখানে সরকার কোটা প্রথা তুলে দিলো, তা ফিরিয়ে আনায় আবারও শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে এসেছে। দলমত নির্বিশেষে তরুণরা মাঠে নেমে এসেছে। আমরা যেহেতু রাজনৈতিক দল করেছি, তাই সরাসরি না থেকে যারা কাজ করছে তাদের সমর্থনে কাজ করবো।’

‘সরকার নানা প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে, আরও ছড়াবে আন্দোলন বিনষ্ট করার জন্য’ বলেও দাবি করেন নুরুল হক। তিনি বলেন, ‘দেশের তরুণরা রাজনীতিবিমুখ। ২০১৮ সালে আমাদের ডাকে তরুণরা সাড়া দিয়েছিল। আমরা যেহেতু এর সূত্রপাত করেছিলাম, তাই তরুণদের সব আন্দোলনেই আমাদের একটি ‘লিগ্যাসি’ থাকবে। অনেকে দল করেছে, কিন্তু তরুণরা নেই। তরুণদের কানেক্ট করতে পারছে না। যেটা ছাত্র অধিকার পরিষদ, গণঅধিকার পরিষদ করতে সক্ষম হয়েছে।’

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নুর বলেন, ‘এটা তো সরকার পতনের আন্দোলন না, সরকার মেনে নিক, সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। না হলে স্পষ্ট হবে, চলমান ইস্যুকে আড়াল করতে এই প্রথা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে সরকার।’

আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির মতো ছাত্রদল, ছাত্র ফেডারেশন ও সাবেক কিছু নেতাকর্মীও রয়েছেন আন্দোলনে।

ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ‘ছাত্রদল সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই মনোভাবকে সম্মান জানিয়ে আন্দোলনে সমর্থন জানাচ্ছে। কোটা প্রথাবিরোধী আন্দোলন একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন। আমরা সম্মান জানিয়ে তাতে নীরবে ভূমিকা রাখছি।’

রাকিবুল ইসলামের ভাষ্য, ২০১৪ সালের বিনা ভোটের নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, আবারও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে। কিন্তু তারা তা করেননি, উপরন্তু ২০১৮-তে রাতের আঁধারে ও ২০২৪-এ ডামি নির্বাচন করেছে। তেমনি কোটা প্রথার ক্ষেত্রেও ঘটেছে। যেখানে ২০১৮ সালের অক্টোবরে ছাত্রদের দাবি মেনে কোটা বাতিল করা হলো, সেটাকে আবার ফিরিয়ে আনার হলো। এটাই হচ্ছে ফ্যাসিজম।’

‘রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতারণা করা আওয়ামী লীগ সরকারের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই কোটা প্রথাকেও ফিরিয়েছে। আমরাও এই আন্দোলনে রয়েছি’, যোগ করেন তিনি।

কর্মসূচিতে সামনের সারিতে দেখা যাচ্ছে ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব উমামা ফাতেমাকে। তিনি বলেন, ‘ন্যায্য আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল যেকোনও সংগঠন সক্রিয় সমর্থন দেয়। বৈষম্যমূলক কোটার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।’

উমামা দাবি করেন, ‘তবে এই আন্দোলন কোনও ছাত্র সংগঠনের ব্যানারে বা পরিকল্পনায় হচ্ছে না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করেছেন, সেই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের দিক থেকে বরং এই ধরনের প্রচারণাকে উসকে দেওয়া হচ্ছে আন্দোলনে বিভক্তি ও নানামাত্রায় হামলা-মামলার ন্যায্যতা তৈরি করার স্বার্থেই।’

উমামা ফাতেমা উল্লেখ করেন, ‘সরকার এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে শিক্ষার্থীদের প্রতি কমিটমেন্ট ও এর ন্যায্যতা অনুধাবন করতে পারবে, সেই প্রত্যাশা করি। সফলতা ছাড়া শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরে যাবে না।’

কোটা প্রথা পুরোপুরি তুলে দিতে হবে কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে আন্দোলনকারী উমামার ভাষ্য,  ‘১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হয়েছিল তাতে মুক্তিযুদ্ধের গুটি কয়েক রাজনৈতিক বিরোধিতাকারী ও তাদের সংগঠন ছাড়া আর সবাই কোনও না কোনোভাবে ভূমিকা রেখেছেন। ফলে এই ভূমিকাকে নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যক মানুষের গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখার প্রচেষ্টা মুক্তিযুদ্ধকে গণমানুষের অংশগ্রহণকে অস্বীকার করার শামিল বলেই আমরা মনে করি।’ তার দাবি, ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনাটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে।’

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ প্রশ্ন রেখেছেন, ‘পাবলিক সার্ভিস কমিশনের হিসাবে, পরীক্ষায় আগে যেখানে কোটা থাকতো, মেয়েরা যে পরিমাণ সুযোগ পেতো, সেই পরিমাণ সুযোগ এই কয়েক বছরে পায়নি।’ এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উমামা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন কোটা তুলে নেওয়ার কারণে নারীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এই দাবির সত্যতাও আছে। বাংলাদেশে এখনও নারীরা নানাদিক থেকে পিছিয়ে, ফলে নারীদের কোটা থাকার যৌক্তিকতা আছে। যেমন প্রয়োজনীয়তা আছে প্রতিবন্ধী ও অনগ্রসর জাতিসত্তার কোটারও।’

তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালের আন্দোলনেও সেই দাবি তোলা হয়েছিল, কিন্তু সরকার সেটি না করে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে। সেই দায় এখন শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করাটা নেতৃত্বের দায়িত্বহীনতাকেই সামনে এনেছে।’

ইতোমধ্যে কোটা প্রথা তুলে দেওয়ার দাবিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানিয়েছে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, গণতন্ত্র মঞ্চ, এবি পার্টিসহ বেশ কয়েকটি বিরোধী দল। রবিবার বিকালে প্রগতিশীল একটি ছাত্র সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছাত্রশক্তির নেতাকর্মী, অনুসারীরা বেশি সক্রিয়। ছাত্র ফেডারেশন আর ছাত্রদলও আছে।’

এসব বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’র সদস্য সচিব নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা এই আন্দোলন সাংগঠনিক কোনও জায়গা থেকে করছি না। এটা একটা ওপেন প্ল্যাটফর্ম। সবাই এখানে যুক্ত হচ্ছে, হবে। আমাদের আন্দোলনে অনেকে আছে, যাদের কেউ কেউ ছাত্রলীগের রাজনীতিও করেছেন। আমরা দলীয় পরিচয়ে আসিনি। চাকরিতে বৈষম্য নিরসনের জন্য ‘ওপেন প্ল্যাটফর্ম’-এর মাধ্যমে দাবি জানাচ্ছি।”

গত মাসের শুরু থেকে চলমান কোটা প্রথাবিরোধী কর্মসূচিতে সক্রিয়দের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শারসিজ ইসলাম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের রিফাত রশিদ, ইংরেজি বিভাগের হাসনাত আবদুল্লাহ প্রমুখ।