• শনিবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||

  • আশ্বিন ৩ ১৪২৮

  • || ১০ সফর ১৪৪৩

শরীয়তপুর বার্তা

যেসব কারণে জামায়াত ছাড়তে চায় বিএনপি

শরীয়তপুর বার্তা

প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১  

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপি দূরত্ব রক্ষা করে চলছে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে জামায়াতকে ছেড়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ বিএনপির ভেতর থেকেই নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কী কারণে এই উদ্যোগ- সে সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে নানা প্রত্যাশা ও রাজনীতির হিসাব-নিকাশের কথা।

দলটির নেতারা বলছেন, প্রথমত, জামায়াতকে ছাড়তে পারলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের পাশাপাশি প্রধান প্রতিবেশী ভারতেরও সমর্থন পাওয়া যাবে। দ্বিতীয়ত, জামায়াত পাশে না থাকলে উদার ও বামপন্থী দলগুলোকে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গঠন করা যাবে। তৃতীয়ত, ‘জামায়াত-বিএনপি বা খালেদা-নিজামী’ বলে জনমনে সৃষ্ট নেতিবাচক পাবলিক পারসেপশনও এতে দূর হবে বলে মনে করছে বিএনপি।

দলটির নেতাদের মতে, বৈশ্বিক রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানের পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সৃষ্ট নতুন পরিস্থিতি থেকেও বিএনপির ‘লাভ’ নেওয়ার সুযোগ আছে। কারণ ওই ঘটনার পরে ডানপন্থী তথা ইসলামপন্থী শক্তির উত্থানের আশঙ্কায় এ অঞ্চলের দেশগুলো নতুন করে হিসাব-নিকাশ কষছে বলে বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা আছে।

ফলে ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার কূটনৈতিক কৌশল নিয়ে অগ্রসর হতে চাইছে বিএনপি। দলটির নেতাদের মতে, ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যমূলক সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলার কারণেই বর্তমান সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে। তাই জামায়াতকে এখনই দূরে রেখে বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি বলে বিএনপির উদারপন্থী নেতারা মনে করেন।

তাঁদের মতে, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরিবর্তন আনা অত্যন্ত কঠিন, যদিও স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারসহ দু-একজন নেতা এর বিরোধিতা করছেন। কিন্তু দলটির মধ্যে দক্ষিণপন্থী নেতার সংখ্যা কমে যাওয়ায় উদারপন্থীদের মতামতই গুরুত্ব পাচ্ছে বলে জানা গেছে।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের দাবি, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সম্পর্কোন্নয়নের দিক থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এখন উদারপন্থীদের উদ্যোগকেই সমর্থন করছেন। শুধু চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ‘সবুজ সংকেত’ দিলেই জামায়াত প্রশ্নে নিষ্পত্তি হয়ে যাবে।

যদিও ভোটের রাজনীতিতে উদার ও বামপন্থী দলগুলোর তুলনায় জামায়াতের প্রভাব বেশি বলে মনে করা হয়। সে কারণেই জামায়াতকে ছাড়লে বিএনপির কী লাভ হবে বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদৌ পাওয়া যাবে কি না- এমন আলোচনা বেশ কয়েক বছর ধরেই বিএনপির ভেতরে-বাইরে ঘুরপাক খাচ্ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গত ৪ সেপ্টেম্বর শনিবার দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জামায়াতকে দূরে রাখার কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা ওঠে। নেতিবাচক পাবলিক পারসেপশন ও আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন আদায়ের বিষয়টি সেখানেও আলোচনা হয়।

জানতে চাইলে বিএনপির ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির সদস্য শামা ওবায়েদ বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে জোট থাকা না থাকার বিষয়ে দলের হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত নেবে। তবে বৈশ্বিক রাজনীতির পাশাপাশি তালেবানের উত্থানের পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নতুন রাজনীতির সঙ্গে অবশ্যই আমাদের সমন্বয় করতে হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির এই সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, ‘নব্বইয়ের দশকের সঙ্গে ২০২১-এর তুলনা করলে ভুল হবে। তা ছাড়া এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে মনে করি, ভারতেরও রিয়ালাইজেশন হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে নয়, পিপল টু পিপল এবং কান্ট্রি টু কান্ট্রি রিলেশনশিপ ডেভেলপ করতে হবে। তাহলেই পারস্পরিক সমস্যাগুলো সমাধানে সুবিধা হবে।’

শনিবারের বৈঠকেও আগে দলটির ভবিষ্যত্ কর্মকৌশল নিয়ে গত দেড় বছরের ধারাবাহিক আলোচনায়ও সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে জামায়াত প্রসঙ্গ। ওই সব আলোচনার সূত্র ধরে এক বছর ধরে একসঙ্গে কর্মসূচি পালন করছে না বিএনপি-জামায়াত। আবার দল দুটির মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাসও তৈরি হয়েছে। বিএনপির সন্দেহ, জামায়াতের সঙ্গে সরকারের গোপন আঁতাত থাকতে পারে। জিয়াউর রহমানের কবর ও তাঁর লাশ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে গত ৩১ আগস্ট জামায়াতের দেওয়া বিবৃতি নিয়ে ওই সন্দেহ আরো বেড়ে যায়। কারণ বিবৃতিতে জিয়াউর রহমানের নাম উল্লেখ না করে ‘দেশের সম্মানিত ও মহান ব্যক্তিদের নিয়ে অহেতুক বিতর্ক’ না করার আহ্বান জানায় জামায়াত।

জানা যায়, ওই ঘটনায় প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয় বিএনপি। ফলে গত ৬ সেপ্টেম্বর সেক্রেটারি জেনারেলসহ জামায়াতের কয়েক নেতাকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় বিএনপিও পাল্টা কৌশলী বিবৃতি দেয়। জামায়াতের নাম না নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ‘দেশব্যাপী বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের’ ঘটনায় নিন্দা জানান।

গ্রেপ্তারের আগে জামায়াতের সাত নেতা মূলত আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠক করছিলেন, যে ঘটনাকেও বিএনপি সন্দেহের চোখে দেখছে বলে জানা যায়। ঘটনার দিন সেখানে জামায়াতের জাতীয় নির্বাচন কমিটির একটি সভা ছিল। গ্রেপ্তারকৃত নেতারা সবাই জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য।

জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ২০ দলীয় জোটের শরিক দল জামায়াতকে নিয়ে নানামুখী আলোচনা হলেও তারা থাকবে কি থাকবে না সে সিদ্ধান্ত দলের স্থায়ী কমিটি নেবে। তবে এখন পর্যন্ত তারা ২০ দলীয় জোটের শরিক দল আছে। বৃহত্তর ঐক্য প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে বিএনপি কাজ করছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার মনে করেন, ‘জামায়াতকে বিদায় করে কোনো বেনিফিট পাওয়া গেলে ভাল। কিন্তু ওরা (জামায়াত) এত দিন ধরে আছে। তাই যা করার সেটা আলোচনা করেই নিষ্পত্তি করা উচিত।’

জানতে চাইলে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম বলেন, ‘বিএনপির ভেতরে কী আলোচনা হয়েছে সেটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। কিন্তু আমাদের কাছে কোনো বার্তা এখনো আসেনি। আমাদের মধ্যে প্রকাশ্যে বৈঠক না হলেও নানা কথাবার্তা হয়। তাই বলা যায়, ২০ দলীয় জোটে জামায়াত এখনো আছে।’