• শুক্রবার   ০৩ ডিসেম্বর ২০২১ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১৯ ১৪২৮

  • || ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৩

শরীয়তপুর বার্তা

টেকসই উন্নয়নে পর্যটন শিল্প

শরীয়তপুর বার্তা

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১  

পর্যটন এখন শুধু কোনো ব্যক্তি বা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর দেশভ্রমণ নয় বরং সমগ্র মানবগোষ্ঠীর জন্য একটি বিশ্বজনীন শখ ও নেশা। আর তাই পর্যটন এখন একটি শিল্প, যা অনেক দেশের অর্থনীতির অন্যতম মুখ্য উপাদান। ‘বাংলাদেশের নদী মাঠ বেথুই বনের ধারে, পাঠিও বিধি আমায় বারে বারে’—সুপ্রাচীনকাল থেকে মানুষ দেশে দেশে ভ্রমণ করে আসছে। পৃথিবী দেখার দুর্নিবার নেশায় মানুষ সাত সমুদ্র তেরো-নদী পাড়ি দিয়ে পৌঁঁছেছে অজানা অচিন দেশে। মানুষের এই দুর্নিবার ভ্রমণাকাঙ্ক্ষা থেকেই পর্যটনশিল্পের উত্পত্তি। সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পর্যটনের রূপ, প্রকৃতিতে এবং সেবার মানে এসেছে অভাবনীয় পরিবর্তন।

১৯৮০ সাল থেকে সমগ্র বিশ্ব জুড়ে ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস উদ্যাপন করা হয়। ২০২০ সালে বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল—গ্রামীণ উন্নয়নে পর্যটন। এ বছর ২০২১ সালে প্রতিপাদ্য ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে পর্যটন’। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি হলো এমন একটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধারণা, যেখানে সমাজের সকলেই তার নিজ নিজ জায়গা থেকে উন্নয়নের ন্যায্য সুযোগ পাওয়ার মাধ্যমে স্থানীয় ও সামগ্রিক পর্যায়ের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখবে। উদাহরণস্বরূপ একটি দেশের মোট উন্নয়ন অন্য দেশের চেয়ে বেশি, কিন্তু এক্ষেত্রে নিম্নবিত্তের অবস্থার উন্নয়ন ঘটছে না, তাই এখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেও সমন্বিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেনি। সমন্বিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি সমাজকে টেকসই উন্নয়নের দিকে ধাবিত করে।

দিন বদলের সনদ রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ইতিমধ্যে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করেছে বাংলাদেশ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০ বাস্তবায়নের জন্য উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পর্যটনশিল্পের ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন, কারণ টেকসই উন্নয়নের ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যে তিনটি সরাসরি পর্যটনশিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটন অবদান রাখে ৮ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিশ্ব জিডিপিতে ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ অবদান। এই শিল্পের সঙ্গে সমগ্র বিশ্বে ৩৩০ মিলিয়ন মানুষ কর্মরত রয়েছে। সমগ্র বিশ্বে ১৫০ কোটি পর্যটক রয়েছে। অতএব প্রতি সাত জনে এক জন পর্যটক। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা অভাবনীয় বৃদ্ধি পেয়েছে ধারণা করা হচ্ছে বাংলাদেশে প্রায় ১ দশমিক ৫ কোটির উপরে অভ্যন্তরীণ পর্যটক সারা দেশে ভ্রমণ করে এবং ৪০ লাখের বেশি মানুষ এই শিল্পে কর্মরত রয়েছে। উল্লেখ্য, এশিয়ার কয়েকটি দেশের আয়ের প্রধান উত্স পর্যটন। সিঙ্গাপুরের জাতীয় আয়ের ৭০ শতাংশ আসে পর্যটন থেকে, তাইওয়ানের আসে ৬৫ শতাংশ, হংকংয়ের ৫৫ শতাংশ, ফিলিপাইনের ৫০ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডের ৩০ শতাংশ।

দেশি পর্যটকদের আনাগোনায় গতি ফিরছে পর্যটনে১৯৯১ সালে বাংলাদেশের পর্যটন নীতিমালার আলোকে পর্যটনকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় এই খাতের সম্ভাবনা অনেক উজ্জ্বল হয়েছে। কিন্তু নানাবিধ সমস্যার কারণে বাংলাদেশে পর্যটনশিল্পের বিকাশে প্রত্যাশিত ও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সাধিত হয়নি। তবে সম্প্রতি করোনা ভাইরাস পর্যটনশিল্পকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে বিধায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডাররা। এমনকি ঋণাত্মক প্রভাব পড়েছে খাতসংশ্লিষ্ট মানুষদের আয়ের ওপর এবং চাকরি হারিয়েছে অনেক লোক। বৈশ্বিক পর্যটনশিল্পে বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানমুখী। বাংলাদেশে পর্যটন আকর্ষণগুলোর মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, মিঠামইন হাওর, সিলেটের চা-বাগান, রাতারগুল, বিছানাকান্দি ও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন, কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত, যেখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। কোরাল আইল্যান্ড সেন্টমার্টিন, রামুর বৌদ্ধমন্দির, হিমছড়ির ঝরনা, ইনানী সমুদ্রসৈকত, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ, টাঙ্গুয়ার হাওর ও কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সহজেই পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়ি অঞ্চল দেখে পর্যটকরা আত্মভোলা হয়ে যায়। আবার আমাদের দেশে অনেক ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে বগুড়ার মহাস্থানগড়, নওগাঁর পাহাড়পুর, দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দির, ঢাকার লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, খান জাহান আলীর মাজার, রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘর, কুষ্টিয়ার লালন সাঁইয়ের মাজার, রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি শুধু দেশি ও বিদেশি পর্যটক ও দর্শনার্থীদের কাছেও সমান জনপ্রিয় ও সমাদৃত।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং পর্যটনের একটি উপস্থাপনায় শ্রমজীবী মানুষের জন্য পর্যটন ধারণাটির বিকাশের রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল, যার উত্পত্তি ফ্রান্সে। এছাড়াও ইউরোপের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে, যেমন গ্রিস, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড ও ইংল্যান্ড। কিছু দেশে বিদ্যমান ভোক্তা সমবায় ভ্রমণ সংস্থার নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। এমনকি সমবায় থেকে উত্পত্তি জাপান ও কোরিয়ায় তাদের সদস্যদের জন্য সেবা প্রদানের জন্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে। মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভিয়েতনাম, চীন ও ভারতে সমবায় পর্যটন রয়েছে। এই ধরনের সমবায় জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে সমবায় পর্যটনকে গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন, যার ফলে একদিকে স্থানীয় লোকদের জন্য কর্মসংস্থান ও কাজের সুযোগ সৃষ্টি এবং অন্যদিকে অধিক বৈদেশিক-মুদ্রা অর্জন সম্ভব। কিছু পর্যটন সমবায়ের সাফল্যের কাহিনি ইঙ্গিত দেয় যে, ইউরোপীয় দৃশ্যপট বাংলাদেশে ছোট আকারে প্রতিলিপি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি সফল মত্স্য সমবায় যা মাছ উত্পাদনের জন্য বর্জ্য জল ব্যবহার করেছে। সোসাইটি এখন একটি প্রকৃতি পার্ক তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে, যা শহরের পর্যটক হট স্পট হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। পার্কটিতে আকর্ষণীয় নৌকাবাইচ সুবিধা রয়েছে এবং একটি বাস্তুতন্ত্র তৈরি করা হয়েছে, যা অসংখ্য পাখিকে আকর্ষণ করে।

সমবায়ভিত্তিক পর্যটন উন্নয়নের মাধ্যমে সমাজের আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আর্থিক সচ্ছলতার পাশাপাশি স্থায়ী উপার্জনের পথ সুগম হবে। পর্যটকরা এখন গ্রামমুখী। গ্রামের নান্দনিক সৌন্দর্য দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা, চাষাবাদ, লোকসংগীত, গ্রামীণ জীবনধারা, সুজলা-সুফলা শস্য শ্যামলার গ্রামবাংলার, জীববৈচিত্র্য ও সবুজের সমারোহ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০ অর্জনের জন্য বিশ্বের উন্নত দেশসমূহ গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়ন, সমবায় পর্যটন উন্নয়ন ধারণার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

পর্যটন একটি শ্রমঘন শিল্প, তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে এই শিল্প অন্যন্য ভূমিকা পালন করতে পারে। পর্যটন উন্নয়নে বাংলাদেশে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে, যার মধ্যে পর্যটননগরী অন্যতম। এতে করে পর্যটকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি হবে এবং বাড়বে কর্মসংস্থান। সরকারি উদ্যোগে মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য বদলে যাবে বাংলাদেশের অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। পর্যটননগরী কক্সবাজারে তিনটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন পার্ক তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এই তিনটি ট্যুরিজম পার্ক হলো সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক, নাফ ট্যুরিজম পার্ক এবং সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক। এই ট্যুরিজম পার্কগুলোতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রতি বছরে বাড়তি আয় হবে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার।

অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সরকারের পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৈষম্যহীনভাবে সকলের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সকল শ্রেণির ব্যক্তিকে যুক্ত করে কর্মশালার আয়োজন আরো বৃদ্ধি করতে হবে। এছাড়াও, স্বেচ্ছাসেবক, ট্যুর অপারেটর, ট্যুর এজেন্সি, হোটেল-মোটেল কর্মীবৃন্দদের অধিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। ফলে উক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনী দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্য দূরীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য গ্রামীণ পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন একান্ত প্রয়োজন। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি-২০৩০) অর্জন ত্বরান্বিত করতে সমবায়ভিত্তিক পর্যটন, গ্রামীণ পর্যটন, কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম, জেলাভিত্তিক পর্যটন, সাংস্কৃতিক পর্যটন ও হাওর পর্যটন উন্নয়নের মধ্য দিয়ে একতা-সাম্য ও সহযোগিতার প্রত্যয় বৃদ্ধি করে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে পর্যটনশিল্প বাংলাদেশে জাতীয় উন্নয়নে বড় অবদান রাখতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে উল্লিখিত পর্যটন প্রসার প্রয়োজন। অল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করলে সমবায় পর্যটন, কমিউনিটি বেইজড পর্যটন আরো সম্প্রসারিত হবে। গ্রামের মানুষের মধ্যে মমত্ববোধ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সহযোগিতা, একতা, সাম্য বৃদ্ধি পাবে—যা বর্তমানে চলমান উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সহযোগিতা করবে এবং বাস্তবায়িত হবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। এভাবেই নবদিগন্তে ভোরের সূর্যের প্রজ্বলিত শিখার মতো আলোকিত হবে অমিত সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প।

লেখক: চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়