• শুক্রবার   ২২ অক্টোবর ২০২১ ||

  • কার্তিক ৭ ১৪২৮

  • || ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

শরীয়তপুর বার্তা

মুমিনের জীবনে তাকওয়ার গুরুত্ব

শরীয়তপুর বার্তা

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর ২০২১  

তাকওয়া আরবি শব্দটির আভিধানিক অর্থ ভয় করা। পরিভাষায় তাকওয়া বলতে মানব মনের এমন এক প্রবৃত্তিকে বোঝায় যা মুমিন ব্যক্তিকে সর্বদা আল্লাহর ভয়ে ভীত রাখে। সে সদা সর্বদা এই ভয়ে ভীত থাকে যে জীবনের ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র কোনো কাজেও যদি আল্লাহর হুকুম অমান্য করা হয়, তা হলেও কিয়ামতের দিন সেজন্য জবাবদিহি করতে হবে এবং জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।

তাই মুমিন ব্যাক্তি সবসময় নিজের আত্মার বাধ্যবাধকতায় নিজ জীবনের যাবতীয় কর্মকান্ড খোদায়ি বিধাণের আলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। অতএব বলা যায়, তাকওয়ার অর্থ হলো- জীবনকে আত্মনিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। অন্যভাবে বললে, মুমিনের আচরণ নিয়ন্ত্রণে আইন, প্রশাসন বা সামাজিক দন্ডের কোনো প্রয়োজন হয় না। তার আত্মার শক্তি অর্থাৎ তাকওয়াই তার সমুদয় আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।

পার্থিব ও পরকালীন জীবনে মানুষের সফলতা লাভের প্রধান অবলম্বন হচ্ছে তাকওয়া। এর অর্থ আল্লাহর ভয়ে নিষিদ্ধ বস্তুগুলো থেকে দূরে থাকা বা যে কাজ করার কারণে মানুষকে আল্লাহর শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়, তা থেকে নিজেকে রক্ষা করা। আর যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় রয়েছে এবং যারা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকেন তাদের বলা হয় মুত্তাকি।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) মুত্তাকিদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে, ‘যারা মহান আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করে এমন সব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকে, যেগুলো হারাম হওয়া সম্পর্কিত বিধান কোরআন-হাদিস থেকে তারা জানতে পারে এবং অনুসরণের জন্য রাসুল (সা.) যা নিয়ে এসেছেন তার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী হয়ে আল্লাহর রহমত কামনা করে।’ (তাফসিরে তাবারি : ১/১৪)। তাকওয়া সম্পর্কে কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেকের উচিত আগামীর (পরকাল) জন্য সে কী প্রেরণ করে তা চিন্তা করা। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।’ (সুরা হাশর : ১৮)

তাকওয়ার প্রভাব : তাকওয়া অনেক বিস্তৃত বিষয়। তা মানুষের মধ্যে ন্যায়-অন্যায় ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার শক্তি জাগ্রত করে। ফলে মন্দ ও অশ্লীল কাজের অসংখ্য সহজ পথ উন্মুক্ত থাকার পরও মুত্তাকি নিজেকে প্রাণপণ তা থেকে বিরত রাখে। দুর্নীতির উন্মুক্ত পরিবেশ বিদ্যমান থাকার পরও সে তা এড়িয়ে চলে। এক কথায় তাকওয়া মানবজীবনকে এমন এক সুদৃঢ ভিত্তির ওপর স্থাপন করে, যা সব ধরনের ভীতি, লালসা, প্রতারণা, প্রলোভন, পদস্খলন থেকে নিরাপদ রাখে।

মুত্তাকির ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘পক্ষান্তরে যে স্বীয় প্রতিপালকের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় করে এবং প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।’ (সুরা নাযিআত : ৪০-৪১)। অন্যত্র বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা যদি তাকওয়া অবলম্বন করো তবে আল্লাহ তোমাদের ন্যায়-অন্যায় পার্থক্য করার শক্তি দেবেন, তোমাদের পাপ মোচন করবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহের অধিকারী।’ (সুরা আনফাল: ২৯)। তাকওয়া কারও ভেতরে থাকলে সে অসদাচরণ করবে না। মানুষকে ঠকাবে না। এমনকি তাকওয়ার গুণ না থাকলে কেউ খাঁটি মুসলমানও হতে পারবে না।

তাকওয়ার পার্থিব প্রতিদান : পার্থিব জীবনে মানুষের প্রত্যাশা বিপুল। মানুষ কামনা করে নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য, পর্যাপ্ত রিজিক এবং পরকালের সফলতা। আর আল্লাহ তাকওয়ার মাধ্যমে সব প্রত্যাশা পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ করে দেন, এমনভাবে রিজিকের ব্যবস্থা করেন যে, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা তালাক : ২-৩)। যারা তাকওয়া অবলম্বন করে আল্লাহ তাদের জন্য আসমান ও জমিনের নেয়ামত উন্মুক্ত করে দেন। তিনি বলেন, ‘যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তাহলে আমি তাদের প্রতি আসমান ও জমিনের কল্যাণ উন্মুক্ত করে দিতাম।’ (সুরা আরাফ : ৯৬)

তাকওয়ার পরকালীন প্রতিদান : আল্লাহর কাছে তাকওয়াই হচ্ছে শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা লাভের মাপকাঠি। অর্থাৎ যে যত বেশি তাকওয়া অবলম্বন করবে সে তত আল্লাহর অধিক প্রিয় বলে গণ্য হবে। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সে ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি।’ (সুরা হুজুরাত : ১৩)। তাকওয়ার গুণই ইহকাল-পরকালে সফলতা এনে দিতে পারে। তাকওয়ার গুণ অর্জনকারীদের আল্লাহ ভালোবাসেন। বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা তাওবা : ৪)।

অন্যত্র বলেন, ‘তার (আল্লাহর) বন্ধু তো কেবল তাকওয়া অবলম্বনকারীরাই।’ (সুরা আনফাল : ৩৪)। আল্লাহর নৈকট্য ও সহায়তা লাভের জন্য তাকওয়া অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রাখ আল্লাহ মুত্তাকিদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা : ১৯৪)। তাকওয়া ঈমানদারকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করে। মহানবি (সা.) বলেন, ‘দুটি চোখ জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। যে চোখ আল্লাহর ভয়ে অশ্রু ঝরায়। আর যে চোখ আল্লাহর পথে পাহারা দিতে গিয়ে নিদ্রাহীন রাত কাটায়।’ (তিরমিজি : ১৬৬৩)।

তাকওয়া অর্জনের উপায় : তাকওয়া অর্জনের অন্যতম উপায় হলো ‘অসিলা’ তালাশ করা। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তার পর্যন্ত পৌঁছার জন্য অসিলা সন্ধান করো। (সুরা মায়িদা : ৩৫)। মুফাসসিরগণ অসিলা এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা করেছেন। কেউ বলেছেন, ‘অসিলা’ হলো নেক আমলের নাম। অর্থাৎ যত বেশি নেক আমল করা হবে, ততই তাকওয়া হাসিল হবে এবং আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জিত হবে। কেউ আবার অন্য ব্যাখ্যাও করেছেন।

তারা বলেন, অসিলা তালাশ করার অর্থ হলো এমন ব্যক্তিদের সাহচর্য গ্রহণ করা, যারা তাকওয়ার গুণে গুণান্বিত। এটি তাকওয়া অর্জনের সবচেয়ে সহজ ও অন্যতম ফলপ্রসূ পন্থা। তাকওয়া অর্জনের অন্যতম আরেক পন্থা হলো, সোহবত বা সাহচর্য। এ কথা স্বীকৃত, সোহবতের মাধ্যমে মানুষের কর্ম ও চিন্তায় এবং চরিত্র ও নৈতিকতায় পরিবর্তন আসে। ভালোদের সঙ্গে ওঠা-বসা হলে তার প্রভাব ব্যক্তি জীবনে পরিলক্ষিত হয়। মন্দদের সঙ্গে যারা চলা-ফেরা হলে মন্দত্বের প্রভাব ওই সত্তার মধ্যে পড়ে। তা ছাড়া দ্বীন মূলত সোহবতের মাধ্যমেই চলমান। সাহাবারা রাসূল (সা.)-এর সোহবত লাভ করেছিলেন। সাহাবাদের সোহবত লাভ করেছেন তাবেঈগণ। এভাবে তাবেঈগণের সোহবত লাভ করেছেন তাবে তাবেঈগণ। আসুন, দুনিয়ার ধোঁকায় না পড়ে পরকালের দিকে ধাবিত হই। তাকওয়ার চর্চা করে মুত্তাকি হই। আল্লাহ আমাদের তার প্রিয় বান্দা হওয়ার তাওফিক দান করুন। উভয় জাহানে সফলতা দান করুন।